প্রতিবেদক : বিডিএস বুলবুল আহমেদ
যুক্তরাজ্যের লেবার সরকারের চ্যান্সেলর রেচেল রিভস দেশের আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে জনগণকে ইচ্ছাকৃতভাবে বিভ্রান্ত করার অভিযোগে তীব্র চাপের মুখে পড়েছেন। অভিযোগ উঠেছে, ৩০ বিলিয়ন পাউন্ডের বিশাল কর বৃদ্ধির পরিকল্পনাকে যৌক্তিক প্রমাণ করার জন্য তিনি দেশের আর্থিক ঘাটতির চিত্রকে অতিশয় অতিরঞ্জিত করেছিলেন। এই সংঘাত এখন লেবার নেতৃত্ব এবং বাজেট ওয়াচডগ (OBR)-এর প্রধানের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
শুক্রবার (২৮ নভেম্বর, ২০২৫) রাতে রেচেল রিভস সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন অফিস ফর বাজেট রেসপনসিবিলিটি (OBR)-এর সাথে, যখন স্বাধীন বাজেট ওয়াচডগটি তাদের গোপন আলোচনার বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ করে।
ওবিআর-এর প্রধান রিচার্ড হিউজ ট্রেজারি সিলেক্ট কমিটিকে পাঠানো এক চিঠিতে নিশ্চিত করেন যে, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে রিভস ও তাঁর কর্মকর্তারা ধারাবাহিকভাবে আর্থিক ঘাটতিকে অতিরঞ্জিত করেছেন, যেন কর বাড়ানোর পক্ষে জনমত তৈরি হয়।
ঘাটতি বনাম উদ্বৃত্ত: ট্রেজারি কমিটিকে পাঠানো চিঠিতে হিউজ স্পষ্ট জানান—রিভস কখনোই ২.৫ বিলিয়ন পাউন্ডের বেশি ঘাটতির মুখোমুখি হননি। উল্টো ৩১ অক্টোবর ওবিআর তার পূর্বাভাস উন্নীত করে এবং রিভসকে জানায় যে, উৎপাদনশীলতার বড় ধরনের নিম্নমুখী সংশোধন সত্ত্বেও তার হাতে ৪.২ বিলিয়ন পাউন্ড উদ্বৃত্ত রয়েছে।
রিভসের অসত্য দাবি: ওবিআর-এর এই বক্তব্যের মাত্র চার দিন পর রিভস ডাউনিং স্ট্রিটে সংবাদ সম্মেলনে দাঁড়িয়ে পরিস্থিতিকে আরও খারাপ দেখানোর চেষ্টা করেন। তিনি ইঙ্গিত দেন যে, ওবিআর-এর পূর্বাভাস প্রত্যাশার চেয়ে খারাপ। তিনি বলেন, অর্থনৈতিক পূর্বাভাস ‘চ্যালেঞ্জিং’ এবং সরকারি অর্থব্যবস্থায় প্রভাব পড়বে, যা তিনি ‘লুকিয়ে রাখতে পারবেন না’, একই সঙ্গে দাবি করেন, ‘আমি জনগণের কাছে সত্য কথাই বলছি।’
তথ্য লুকানোর অভিযোগ: পরে যখন সরকার আয়কর বাড়ানোর পরিকল্পনা থেকে সরে আসে, তখন দাবি করে যে 'তথ্য বদলে গেছে'। কিন্তু ওবিআর-এর প্রতিবেদনে স্পষ্ট, রিভসের সংবাদ সম্মেলন ও সরকারের অবস্থান বদলের মধ্যে ওবিআর কোনো নতুন সংশোধিত পূর্বাভাস দেয়নি।
উত্তেজনা: হিউজ স্পষ্ট করেন, "কোনো পর্যায়েই সরকারের আর্থিক লক্ষ্যগুলো ২.৫ বিলিয়নের ডলারের বেশি ঘাটতির মুখে পড়েনি।" শুক্রবার রাতে রিভস দ্য গার্ডিয়ানে ওবিআর-এর বিরুদ্ধে সঠিক তথ্য না দেওয়ার অভিযোগ আনলেও, হিউজ সেই তথ্য ৭ আগস্টই দেওয়ার কথা জানান।
এই ঘটনার জেরে রেচেল রিভস এবং ওবিআর প্রধান রিচার্ড হিউজ—দুজনের ভবিষ্যৎই এখন অনিশ্চিত। ট্রেজারি ওবিআর-এর বিরুদ্ধে গোপন নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়া প্রকাশ করে ‘গোপনীয় নীতিনির্ধারণের পরিবেশ’ ভেঙে দেওয়ার অভিযোগ তুলেছে, যা লিজ ট্রাসের সময়ের মতো অভ্যন্তরীণ সংঘাতের স্মৃতি জাগায়।
কনজারভেটিভ দলের শ্যাডো চ্যান্সেলর স্যার মেল স্ট্রাইড বলেন, "এখন সত্য প্রকাশিত। তিনি দাবি করেছিলেন বাজেট কঠিন হবে কারণ পূর্বাভাস খারাপ হয়েছে। অথচ ওবিআর বলছে, বিষয়টি সত্য ছিল না।"
কনজারভেটিভ কেমি ব্যাডেনক রিভসকে বরখাস্ত করার দাবি জানিয়ে বলেন,
"রিভস মাসের পর মাস মিথ্যা বলেছেন—অতিরিক্ত কর আরোপের অজুহাত বানাতে। তার বাজেট স্থিতিশীলতার জন্য নয়; এটি ছিল রাজনীতি—নিজের অবস্থান বাঁচাতে লেবার এমপিদের খুশি রাখার পরিকল্পনা। লজ্জাজনক।"
যুক্তরাজ্যের এই ঘটনাটি বাংলাদেশের দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসের সেই অধ্যায়গুলোকে মনে করিয়ে দেয়, যেখানে আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে সর্বদা প্রশ্ন উঠেছে:
১৯৭০-এর দশক: ক্ষমতার অপব্যবহার: বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের পর (১৯৭২-৭৫) থেকে আর্থিক বিষয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার ও তথ্য গোপন করার সংস্কৃতি শুরু হয়। রাজনৈতিক নেতারা প্রায়শই নিজেদের সুবিধা এবং ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য আর্থিক তথ্যকে জনসম্মুখে বিকৃত করেছেন।
১৯৯০-এর দশক: পারস্পরিক দুর্নীতি: ১৯৯০-এর দশকে গণতন্ত্র ফিরলেও আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়েই ক্ষমতায় থাকাকালীন একে অপরের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এনেছে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দেওয়া তথ্যকে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করার নজির কম ছিল না।
২০১৪-২০২৪: তথ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ: বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কালে (২০১৪-২০২৪) রাষ্ট্রের আর্থিক তথ্য এবং স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর (যেমন: বাংলাদেশ ব্যাংক) তথ্যের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ আরোপের ব্যাপক অভিযোগ উঠেছিল। বিশেষ করে, ব্যাংক খাতের বিপুল ঋণখেলাপির তথ্য বা রিজার্ভের হিসাব নিয়ে জনগণের সামনে সত্য তুলে ধরায় অসঙ্গতি ছিল প্রকট। সমালোচকরা বলেন, এটি ছিল 'চোরতন্ত্র' প্রতিষ্ঠার একটি অংশ।
২০২৫: জবাবদিহিতার সুযোগ: ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর ২০২৫ সালে এসে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে জবাবদিহিতা শুরু হয়েছে (যেমন: শেখ হাসিনার মামলার রায় এবং ভল্টে স্বর্ণ উদ্ধার)। যুক্তরাজ্যের ঘটনাটি প্রমাণ করে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অধীনে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান (যেমন OBR) সরকারের উচ্চপর্যায়ের মিথ্যাচারকেও প্রকাশ করতে পারে, যা জবাবদিহিমূলক রাজনীতির জন্য অপরিহার্য।
রেচেল রিভসের এই ঘটনা আন্তর্জাতিকভাবে প্রমাণ করে, ক্ষমতা ধরে রাখতে এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য আর্থিক তথ্য বিকৃত করা একটি বৈশ্বিক সমস্যা।
দ্য টেলিগ্রাফ (ট্রেজারি ও ওবিআর সংঘাত সংক্রান্ত রিপোর্ট)
অফিস ফর বাজেট রেসপনসিবিলিটি (OBR)-এর প্রধান রিচার্ড হিউজের ট্রেজারি কমিটিতে পাঠানো চিঠি
গুগল অনুসন্ধান থেকে প্রাপ্ত বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী আর্থিক অসঙ্গতি ও রাজনৈতিক ইতিহাস বিশ্লেষণ (১৯৫০-২০২৫)
প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |